এক্সক্লুসিভ

হোটেল রেইনট্রিতে যেভাবে তোলা হয়েছিল ফেসবুকে ছড়ানো দুই তরুণীর ছবিগুলো

হোটেল রেইনট্রিতে যেভাবে তোলা হয়েছিল ফেসবুকে ছড়ানো দুই তরুণীর ছবিগুলো

রাজধানীর বনানীতে রেইনট্রি হোটেলে ধর্ষণের শিকার দুই তরুণীর ছবি ফেসবুকে প্রকাশ করে ভার্চুয়াল নির্যাতনে মেতে উঠেছে ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্তদের সমর্থক একটি গোষ্ঠী। যথারীতি ধর্ষণের শিকার দুই তরুণীকেই দায়ী করছে বেশ কিছু মানুষ। কিন্তু সেই ছবিগুলো কীভাবে, কখন, কোন পরিস্থিতিতে তোলা হয়েছিল? একটিবারও কি কেউ প্রশ্ন করে দেখেছেন? লন্ডন প্রবাসী আইনজীবি নিঝুম মজুমদার ভিক্টিমদের সঙ্গে কথা বলে ফেসবুকে জানিয়েছেন সেই ছবির পেছনের গল্প। তার ফেসবুক স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধরা হলো:


এই ধরনের পরিস্থিতিতে এই রকম প্রশ্ন করাটা পাপ অন্তত আমি যেখানে পুরো ঘটনাই ভালো করে জানি কিংবা শুনেছি। তারপরেও আমি টেলিফোনের ওপার থেকে তাকে প্রশ্ন করি, “ফেসবুকে একটি ছবি ভাইরাল হয়েছে, আপনি জানেন?”

মোবাইলের পর্দায় উত্তর ভেসে আসে, “জানি ভাইয়া। জানবো না কেন? সারাটা দিন তো মানুষ আমাদের এই ছবিই দেখায়…এই দেশের মানুষ একটু একটু করে আমাদেরকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এখন আত্নহত্যা ছাড়া আমাদের পথ নেই”

কারো সাথে টেক্সট আদান-প্রদানে অন্য দিক থেকে ব্যাক্তির অনুভূতি, বক্তব্যের টোন বোঝা যায়না। কিন্তু আমার মনে হলো, আমি যেন সেটি বুঝতে পারলাম।

একটা বিষাদগ্রস্থ দীর্ঘশ্বাসের শব্দ কি ভেসে এলো? একটা কান্নার শব্দ? কী জানি…আমার মনে হলো একটা গোপন ব্যাথাবোধ কি করে যেন একজন আহত মানুষের মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বরে বের হয়ে গেলো। কষ্টের কি শব্দ হয় কিংবা গ্লানির? দুঃখের কি শব্দ হয় কিংবা বেদনার? জানিনা…

আমরা টেক্সটের উভয় দিকে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকি। আমি একবার টাইপ করি, একবার মুছে দেই। আরেকবার টাইপ করি, আরেকবার মুছে দেই। কী লিখব, কী বলব কিছুই বুঝতে পারিনা। আমার এই সংকট তিনি খুব সম্ভবত বুঝতে পারেন। আমার সকল অযাচিত কৌতূহল, আমার পৌনঃপূনিক প্রশ্নের উত্তরে তিনি লেখেন,

“ভাইয়া এই ছবিটা ওই ঘটনার পরে তোলা। এই ছবিটার জন্য আমাকে একবার বলা হলো, “পোজ দিয়ে ছবি তোল। ” একবার বলা হলো, “এই হাসিস না কেনো? হেসে হেসে পোজ দে। ” একবার বলা হলো, “আমাকে চুমু দিচ্ছিস এইভাবে পোজ দিয়ে ছবি তোল, সামনে কাজে লাগবে”
“আমি কী করে রেজিস্ট করি ভাইয়া? একদিকে একটা ভয়ংকর দর্শন বডিগার্ড, একদিকে পিস্তল তাক করা, একদিকে আরেকজন ছোটবোনকে আমাদের ডাক্তার বন্ধুর সাথে জোর করে অন্য রুমে আটকে রাখা হয়েছে। গাড়ির চাবিটা আটকে রেখেছে। আমি কিভাবে আটকাবো ভাইয়া? আপনি একজন আইনের মানুষ, আপনি বোঝেন না ভাইয়া? একটা মেয়ে ঠিক কোন অবস্থাতে অমন ছবি তোলে ঠিক অমন একটি দিনে?”

আমি কোনো উত্তর দেইনা। চুপ করে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাই, টেবিলের উপর পেপার ওয়েটকে অবিন্যাস্ত করে ঘোরাই…খামাখাই একটা কাগজকে দলাই মোচড়াই…আমি ঠিক কি বলব, বুঝে উঠতে পারিনা…

আমাকে আবার যেন তীক্ষ্ণ তীরের মত বিদ্ধ করা হয়। আরেকটি টেক্সট আসে আমার মোবাইলে- “ভাইয়া উত্তর পেয়েছেন? আমার কিংবা আমাদের সতীত্ব কি আপনার কাছে প্রমাণ করতে পারলাম?”

একটা প্রকাশিত দীর্ঘঃশ্বাস আমার মোবাইলের স্ক্রিনটিকে ঘোলা করে দেয়। আমি স্থির হয়ে বসে থাকি। কি বলব কিংবা কি-ই বা বলা যেতে পারে? দুটি মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়েছে নোংরা কিছু পশুর দ্বারা। তারা সাহস করে সে কথা বলেছে পুলিশকে। কিন্তু এই সোনার বাংলাদেশ সেটি কেন বিশ্বাস করবে? এই সোনার বাংলাদেশে সেটি কেন মেনে নেবে?

এই সোনার বাংলাদেশ সেই মেয়েটিকে সকল অবিশ্বাস নিয়ে আঘাতের পর আঘাত করে, করতে থাকে..
(১) এত রাতে হোটেলে ভদ্র মেয়েরা যায়?
(২) ৬ টার পর মেয়েদের আবার বাইরে কি?
(৩) ওরে বাবা!!! হোটেলে গেছে!
(৪) ওরে বাবা, ছেলেদের সাথে?
(৫) ওরে বাবা পার্টি করে মেয়ে?
(৬) ওরে বাবা, এই ড্রেস পড়েছে?
(৭) ওরে বাবা, মেয়ে নিশ্চই খারাপ, তা না হলে যাবে কেন?
(৮) আরে টাকার জন্য এমন করতেসে, এইগুলারে ধর্ষণ করাটাই ঠিক
(৯) আরে, এগুলা কি ভালো মাইয়া?

এসব আঘাত যখন দূর্দান্ত ক্ষত হয়ে চারিদিকে বিষাক্ত পুঁজ ছড়িয়েছে ঠিক তখন এই সোনার বাংলাদেশ এবার তার গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ছুঁড়ে দিয়েছে। ধর্ষকের সাথে ভিকটিমের ছবি অনলাইনে দিয়েছে বিভিন্ন নামে।
আমি আবার সেই ছবির দিকে তাকাই…

ক্লান্ত, গ্লানিময়, বিষাদগ্রস্থ একটা চোখ। আলুথালু চুল। এবার মনে হলো ছবিটা আমাকে কিছু বলছে। মেয়েটার চোখে প্রাণ নেই, গোপন একটা দীর্ঘঃশ্বাস চেপে রেখে একটা পশুকে চুমু দিতে হচ্ছে, সেই গ্লানি মেয়েটার দু’টি চোখে জ্বল জ্বল করছে সুতীব্র বেদনার মত। আমরা সেই ছবি দেখে আমাদের যাবতীয় বিশ্বাস-অবিশ্বাস-যুক্তি- সব কিছু ফেলে ঠিক নিজের মত করে বুঝে নিয়েছি। আমরা এসব বোধগম্যতা থেকে বলি- “আরে আগেই কইছিলাম এইখানে কোনো কাহিনি আছে। এইবার বুঝলেন তো?”

এই সমাজ, এই সমাজের কিছু মানুষ, এই সমাজের কিছু পঁচে যাওয়া বিবেক এই ভিকটিমদের আস্তে আস্তে খুন করছে। অথচ এমন হবে কথাই ছিলোনা। কথা ছিলো একটি অন্যায়ের প্রতিবাদ আমরা করব। কথা ছিলো ‘না মানে না’ বাক্যে আমরা বিশ্বাস করব, কথা ছিলো ধর্ষকদের আমরা বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাব।

কিন্তু সেটি এই দেশে হবার নয়। এই দেশ হঠাৎ করে একদিন চট করে তার শিরদাঁড়া নিয়ে ঘুরে ওঠে আবার ঠিক কিছুক্ষণ পর কোনো কারন ছাড়া সকল অবিশ্বাস নিয়ে আবার শিরদাঁড়া নেতিয়ে নিয়ে, লেজ গুটিয়ে পালায়। ইনফ্যাক্ট, আমার মনে হয় এই দেশ পালাবার ছুঁতো খোঁজে। তাই সে সামনে খড়কুটো পেলেও সেটিকে অক্টোপাসের নাম দিয়ে একটা এক্সকিউজ বের করে ফেলে। বলে উঠে- “সামনে একটা বিরাট অক্টোপাস পড়েছিলো, তাই বিপ্লব করতে পারলাম না। পরের বার ফাটিয়ে দিব!”

একটি মেয়েকে ধর্ষণ করে তাকে দিয়ে জোর করে ছবি তুলেছে ধর্ষক। এই সামান্য বিষয়টা কি এই দেশ জানেনা, বোঝেনা? বোঝে। সব বোঝে। বুঝেও না বুঝার ভান করে পালিয়ে বেঁচে থাকতে চায় বলেই সেই বুঝতে পারা মানুষগুলো অমন করে খড়কুটোকে অক্টোপাস বানায়…এই ছবিটি এখন যেমন করে হয়ে গেলো অক্টোপাস কিংবা যেমন করে ধর্ষণকে জাস্টিফাই করে দিলো…

স্থানুর মত বসে আছি। কিছু ভালো লাগেনা। লন্ডনের এই তীব্র শীত, প্যাচপ্যাচে বৃষ্টি সব কিছু এক ঘেয়ে লাগে। মনে হয় যদি সব কিছু থেকে একটু পালিয়ে যাওয়া যেতো। মনে হয়,এই মানুষগুলো থেকে যদি হারিয়ে যাওয়া যেতো…

পালাব কোথায়? আবার তাও ভাবি। সেই কন্ঠ তো আমাকে অভিশাপ দিয়েছে তার দীর্ঘঃশ্বাস দিয়ে। সেই কন্ঠ তো আমাকে সারাটি জীবনের জন্য অপরাধী করে দিয়েছে তার সকল কষ্ট দিয়ে। সে কষ্ট আমাকে তাড়িয়ে বেড়াবে…আমি যেন সেটির একটি চিহ্ন এখনই বুঝতে পারি। পাশে নেই তিনি তাও শুনতে পাই-
“ভাইয়া উত্তর পেয়েছেন? আমার কিংবা আমাদের সতীত্ব কি আপনার কাছে প্রমাণ করতে পারলাম?”

Loading...

সর্বোচ্চ পঠিত

Loading...
Loading...
To Top